
খবরের কাগজ: পাটশিল্পের বর্তমান অবস্থা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
জহিরউদ্দিন রাজিব: পাট বাংলাদেশের সোনালি আঁশ, এটা আগেও ছিল, এখনো আছে এবং আগামীতেও থাকবে। কারণ পাটই পৃথিবীর একমাত্র পণ্য যা পরিবেশবান্ধব এবং সারা বিশ্বের মোট চাহিদার ৮৭ ভাগই পূরণ করা হয় বাংলাদেশের উৎপাদিত পাট হতে। বাংলাদেশে বর্তমান পাটশিল্পের সার্বিক অবস্থা খারাপ নয়। তবে বিভিন্ন সময় সরকারি নানা ধরনের জটিলতা, অবহেলা ও বিদেশি নানা রকম ষড়যন্ত্রের শিকারের কারণে কিছুটা কোণঠাসা হয়ে আছে পাটশিল্প। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পাটই হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চাকা ঘোরানোর অবলম্বন। আমাদের কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে ভারত যদি অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে তবে আমাদের পণ্য আমরা সরাসরি রপ্তানি করে অবশ্যই অধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারব। তার জন্য বাস্তবমুখী নীতি ও দেশীয় কাঁচামাল ভিত্তিক রপ্তানি পণ্যে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
খবরের কাগজ: পাটকে সোনালি আঁশ বলা হলেও এ খাত কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি- এর প্রধান কারণ কী?
জহিরউদ্দিন রাজিব: পাট খাতে উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আশানুরূপ আলোর মুখ দেখতে পায়নি। এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- পাট খাতে সময়োপযোগী ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নে দীর্ঘসূত্রিতা। এ ছাড়া পাটকে কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণা করা সত্ত্বেও কার্যকর না হওয়ায় এ খাত পিছিয়ে গেছে। এ খাতে নতুন বিনিয়োগ খুব কম এসেছে। যে কারখানাগুলো আছে সেগুলোর সিংহভাগই প্রায় ৩০ বছরের পুরোনো। ফলে এখানে নতুন করে দক্ষ ব্যবস্থাপনা আসেনি। বরং দুর্নীতি ও প্রযুক্তির ঘাটতির কারণে বারবার পিছিয়ে পড়েছে। এ ছাড়া উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। পলিথিন ও সিনথেটিক পণ্যের দাপটে পরিবেশবান্ধব পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা কমে গেছে। কিন্তু আমরা পাটের সোনালি অতীতকে ফিরিয়ে আনতে যথাযথ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করিনি। পাটের মূল্য নির্ধারণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় নজরদারি না থাকায় একই পাটে কৃষক পান ৩ হাজার আর ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা সেটিই বিক্রি করে ৮ হাজার টাকা। ফলে মিলগুলোকে বেশি দামে পাট কিনতে হয় আর উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় বেশি দামে পণ্য বিক্রি করতে হয়, যা বিশ্ববাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ের অভাব, এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানের জন্য রপ্তানি নীতি শিথিলতার ঘাটতি তো আছেই।
খবরের কাগজ: পাট খাতের উন্নয়নে সরকার কোন ধরনের নীতিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিচ্ছে?
জহিরউদ্দিন রাজিব: পাট খাতের উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু অন্য শিল্পের তুলনায় এ খাতের বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ যথেষ্ট নয়। সরকার এই খাতে নগদ সহায়তার বিষয়টি চালু করেছে। কিন্তু পর্যায়ক্রমে এখন হার কমানোর ফলে এতটাই তলানিতে পৌঁছেছে যে, এই টাকা পেতে যে পরিমাণ খরচ করতে হয় নগদ সহায়তার পরিমাণ তার চেয়ে অনেক কম। ফলে আমাদের লোকসান হয়। তা ছাড়া নগদ সহায়তা গ্রহণের বিপরীতে যাচাই-বাছাইয়ের নামেমিল মালিকদের নানা হয়রানি ও ভোগান্তি পোহাতে হয়। তাতে করে যে পরিমাণ নগদ সহায়তা দেওয়া হয় তার চেয়ে বেশি খরচ হয়। অর্থাৎ খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি। তার মানে নীতি সহায়তা দেওয়া হলেও তা কাজে আসছে না। নগদ সহায়তা না দিয়ে বরং পাট খাতকে কৃষিপণ্য ঘোষণা করে তার আওতায় সব সুযোগ-সুবিধা দিলে একদিকে যেমন প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা হবে অন্যদিকে ঝামেলা কমবে।
খবরের কাগজ: বিশ্ববাজারে পাটের চাহিদা বাড়াতে কোন ধরনের প্রস্তুতি দরকার?
জহিরউদ্দিন রাজিব: পরিবেশবান্ধব পণ্য হিসেবে পাটই একমাত্র পণ্য যা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এর চাহিদা পরিবেশবাদী জনগোষ্ঠী তথা সচেতন মহলের কাছে দিন দিন বেড়েই চলেছে। ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। বর্তমানে চাহিদার ৪০ শতাংশ প্রতি বছর ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এরকম অবস্থা বিরাজমান থাকলে ঘাটতির হার বাড়বে বলে আমি মনে করি। আর এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন থেকেই সরকারকে অধিক মনোযোগ দিতে হবে। সরকারি আওতাধীন বন্ধ মিলগুলোকে পুনরায় চালু, পাট খাতকে কৃষিপণ্য ঘোষণাসহ ব্যাংক সুদ হার ৪ শতাংশ নির্ধারণ, রপ্তানি নীতিমালা সহজীকরণ, জাহাজ ভাড়ার স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি। পাটকলগুলোর জন্য আলাদা নীতিমালা প্রণয়ন করলে এ খাতকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।
খবরের কাগজ: আপনার প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কিছু বলুন।
জহিরউদ্দিন রাজিব: আমাদের প্রতিষ্ঠান একেবারেই অজোপাড়াগায়ে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে পর্যায়ক্রমে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ১২০-১৫০ টন প্রতিদিন গড় উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করেছে। আর এসব উৎপাদিত পণ্য বিশ্বের প্রায় ৪০টির মতো দেশে রপ্তানি হয়ে থাকে। উন্নয়নের ছোঁয়া এখানে এখনো পুরোপুরি লাগেনি। আমরা মূলত এই অঞ্চলের উন্নয়ন ও হতদরিদ্র মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলাম। বর্তমানে এখানে প্রায় ৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। আরও কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। যেগুলো বাস্তবায়িত হলে হয়তো আরো ৩-৪ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে।
খবরের কাগজ: আপনারা এখন কোন কোন দেশে পণ্য রপ্তানি করছেন?
জহিরউদ্দিন রাজিব: আগেও বলেছি, আমাদের পণ্যগুলো প্রায় ৪০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশ হলো- চীন, ভারত, রাশিয়া, বেলজিয়াম, তুরস্ক, দুবাই, সৌদি আরব, মেক্সিকো, স্পেন, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, কেনিয়া, জাপান, আইভরিকোস্ট, পোল্যান্ড ইত্যাদি। উক্ত দেশগুলোতে আমাদের সব উৎপাদিত পণ্যের (জুট ইয়ার্ন, জুট ব্যাগ, জুট হ্যান্ডিক্রাফট) চাহিদা রয়েছে। উৎপাদনকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে উন্নত মেশিন, দক্ষ জনবল, ক্রেতার চাহিদা মোতাবেক উন্নতমানের পণ্য তৈরি এবং সরবরাহ ছাড়াও সময়মতো শিপমেন্ট সম্পন্ন করা হয়।
খবরের কাগজ: উৎপাদন খরচ কমিয়ে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে আপনারা কোন ধরনের কৌশল গ্রহণ করেছেন?
জহিরউদ্দিন রাজিব: উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানে কাঁচামাল কেনার ক্ষেত্রে যত কম দামে মাল কেনা যাবে তত বেশি মুনাফা অর্জন করা সম্ভব হবে। সাধারণত আমরা মৌসুমের শুরুতে আমাদের বাৎসরিক মোট চাহিদার ৫০ শতাংশ কাঁচা পাট সংগ্রহ করে মজুত করি। বাকি ৫০ শতাংশ ক্রেতার চাহিদামতো সারা বছর কেনা হয়। এতে করে কাঁচামালের সরবরাহ যেমন সহজ হয় তেমনি উৎপাদন খরচও সাশ্রয় করা সহজ হয়।
খবরের কাগজ: আপনি কি মনে করেন, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ উদ্যোগ পাট খাতকে এগিয়ে নেবে?
জহিরউদ্দিন রাজিব: আসলে আমার মতামত পাবলিক-প্রাইভেট এখানে ততটা মুখ্য নয়। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করলে সফলতা আসবে।
খবরের কাগজ: একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
জহিরউদ্দিন রাজিব: বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কার্যাবলিকে একত্রিত করে বৃহৎ আকারে সফলভাবে শেষ করার মাধ্যমেই বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলি সম্পূর্ণ হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করি, গুণগত মানসম্মত পণ্য চূড়ান্তভাবে ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে। এতে করে ক্রেতা ও বিক্রেতার সম্পর্ক ভালো থাকে ও পণ্যের চাহিদা বাড়ে।
খবরের কাগজ: পাটশিল্পে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আপনি কী পরামর্শ দেবেন?
জহিরউদ্দিন রাজিব: অনুকূল পরিবেশগত কারণে পাট বাংলাদেশের জন্য আল্লাহর এক অশেষ নেয়ামত। আমরা ভাগ্যবান হিসেবে এই পাটের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশের আয় সামাজিক উন্নয়নের জন্য নিজেকে নিবেদিত করতে পারি। এর মাঝেই লুকিয়ে রয়েছে বাংলাদেশের উন্নয়নের অপার সম্ভাবনা। পণ্যের প্রকৃত ব্যবহার করে নতুন নতুন পণ্য উদ্ভাবনের মাধ্যমে রপ্তানি বাড়াতে হবে।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন