মোঃ মিজানুর রহমান স্টাফ রিপোর্টার
মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর ২০২৫
সরকারি স্কুলের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের দীর্ঘ দিনের নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিক কর্মসূচিতে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের দাবিদাওয়ার ব্যপারে কোন সাড়া না পেয়ে এবার কর্মবিরতির মতো কর্মসূচি ঘোষণা করতে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থার কর্মরত পেশাজীবীদের পাশাপাশি বেসরকারি মাধ্যমিক, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সরকারি কলেজ শিক্ষকগণের আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের পর এবার অনন্যোপায় হয়ে আন্দোলনের ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
দীর্ঘদিনের চলমান বঞ্চনা, বৈষম্য এবং বকেয়া আর্থিক সুবিধা বঞ্চিত শিক্ষকগণ সমিতির ব্যানারে দাবি আদায়ে আন্দোলনের পথে নামছেন বলে জানিয়েছেন একাধিক শিক্ষক নেতা।
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির ব্যানারে এবং স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও এন্ট্রি পদ নবম গ্রেড বাস্তবায়ন পরিষদের পক্ষ থেকে দীর্ঘ দিন ধরে যে দাবি জানিয়ে আসছেন তা হলো:
১) এন্ট্রি পদ ৯ম গ্রেড ধরে চার স্তরীয় পদোসোপান প্রবর্তন পূর্বক মাধ্যমিকের জন্য একটি স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বাস্তবায়ন।
২) সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে বকেয়া টাইমস্কেল / সিলেকশন গ্রেডের মঞ্জুরি আদেশ প্রদান ও এডভান্স ইনক্রিমেন্ট সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন।
৩) বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখায় কর্মরত শিক্ষকদের বিভিন্ন শূন্য পদে নিয়োগ পদোন্নতি ও পদায়ন।
৪) সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসার ও জেলা জেলা শিক্ষা অফিসার পদে প্রকল্প থেকে আগত উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের পদায়নের উদ্যোগ বন্ধ করা এবং আঞ্চলিক উপপরিচালকের কার্যালয়ের স্বাতন্ত্র্য ও মর্যাদা রক্ষা।
এই দাবিতে ইতোপূর্বে তাঁরা নিয়মতান্ত্রিক সব ধরনের কর্মসূচি পালন করে আসছেন। এখন সরকারের শেষ সময়ে এসে কর্মরত শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। আর তাই মাঠ পর্যায়ের শিক্ষকদের দাবির প্রেক্ষিতে এবার আন্দোলনে নামতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির অন্যতম সমন্বয়ক ও সরকারি করোনেশন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোঃ ওমর ফারুক। তবে তাদের দাবিগুলো আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পূরণ করার সুস্পষ্ট ঘোষণা দিলে এ ব্যাপারে নেতৃবৃন্দ সরকার তথা মন্ত্রণালয়কে তিন কার্যদিবসের সময় দিতে চান অন্যথায় তাঁরা চলমান বার্ষিক পরীক্ষায় কক্ষ পরিদর্শন, খাতা মূল্যায়ন, ফলাফল প্রস্তুতকরণ ও নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম বর্জনের মতো বিদ্যালয়ে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি পালন করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
উল্লেখ্য দেশের সাত শতাধিক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত প্রায় ২ সহস্রাধিক শিক্ষক ১৫ বছরের অধিক পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে হতাশায় নিমজ্জিত, এছাড়া তিন শতাধিক প্রধান শিক্ষক, পাঁচ শতাধিক সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য, দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত রয়েছেন এমন শিক্ষকদের দিয়ে কাজ চালিয়ে নিলেও তাদেরকে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে না! এদিকে ৩৩ জেলায় জেলা শিক্ষা অফিসার এবং প্রায় সব জেলাতেই সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসারের পদ শূন্য পড়ে আছে। ফলে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসন মারাত্মকভাবে সংকটে পড়েছে। অথচ এ ব্যাপারে সরকারের কোনো মাথা ব্যাথা নেই!
শিক্ষকরা বলছেন, স্বাধীনতার আগ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের বিভিন্ন পদের বেতন স্কেল সমান হলেও পরবর্তীতে প্রায় সব পদই নবম গ্রেডে উন্নীত হয়ে বর্তমানে তাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তাদের পদটির ষষ্ঠ গ্রেডে পদ উন্নয়নের প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে! অথচ শুধুমাত্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে কর্মরত শিক্ষকদের ১০ম গ্রেডেই রেখে দেওয়া হয়েছে যা সুস্পষ্ট বৈষম্য! অথচ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক নিয়োগের সময় চাওয়া হয় বিসিএস ক্যাডারের সমমানের যোগ্যতা এবং অতিরিক্ত হিসেবে আবার শিক্ষায় ব্যাচেলর ডিগ্রী বাধ্যতামূলক! তাই যৌক্তিক কারণেই সরকারি মাধ্যমিকের সহকারী শিক্ষক পদের ৯ম গ্রেড ক্যাডার মর্যাদার দাবি দীর্ঘদিনের।
আবার সরকারি কলেজের শিক্ষকদের সুনির্দিষ্ট চার স্তরীয় একাডেমিক পদসোপান থাকলেও সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য নেই কোনো একাডেমিক ক্যারিয়ারপাথ! ফলে ৯৭% শিক্ষক যেই পদে যোগদান করেন, সেই পদে থেকেই অবসরে যান! অন্যদিকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার শিক্ষক ১৫-২০ বছর চাকরি করেও তাদের বকেয়া টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পাননি! অন্য সেক্টরে সবাই পেয়ে গেলেও সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরও আট মাস ধরে মঞ্জুরি দেশ দেওয়া হচ্ছে না! ফলে আর্থিক টানাপোড়েনে শিক্ষকগণ বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারে মানবতর জীবন যাপন করছেন!
এ বিষয়ে টাইমস্কেল–সিলেকশন গ্রেড বাস্তবায়ন উপকমিটির আহ্বায়ক, সবুজবাগ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মো. আবদুস সালাম বলেন,
“শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বারান্দা বারান্দায় ঘুরেও আমরা কোনো সুরাহা করতে পারছি না। মাঠপর্যায়ের শিক্ষকরা জানিয়ে দিয়েছেন—৩০ নভেম্বরের মধ্যে সমাধান না হলে কেন্দ্রের নির্দেশ ছাড়াই ‘No time scale–selection grade, No work’ কর্মসূচি শুরু করবেন তাঁরা।”
এদিকে মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে গত ১৭ নভেম্বর মন্ত্রণালয় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারদের মধ্য থেকে সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসার পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করায় এই পদের ফিডার পদধারী ও বিধিগতভাবে পদোন্নতির দাবিদার শিক্ষক সমাজে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে! বিদ্যমান বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কাঠামো অনুযায়ী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার পদটি সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসার এবং জেলা শিক্ষা অফিসার পদের ফিডার পদ নয়, তাই চলতি দায়িত্ব দেওয়ার কোনো বিধিগত সুযোগ নেই। চলতি দায়িত্ব নীতিমালা ২০২৩ অনুযায়ীও নন-ফিডার পদ থেকে কাউকে দায়িত্ব প্রদান করা যায় না।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন