বেনজীর আহমেদ মুকুল
দিঘলিয়া প্রতিনিধিঃ
ডিপো কর্মকর্তা-কর্মচারী, ডিলার ও শ্রমিকদের আঁতাতে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার জ্বালানি পাচার; ধরা পড়লেও মুহূর্তেই তৈরি হয় বৈধ কাগজপত্র।
খুলনার ভৈরব নদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জ্বালানি তেলের ডিপোগুলোতে চলছে ভয়াবহ অনিয়ম ও চুরির মহোৎসব। মেসার্স পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা ডিপোতে আসা ট্যাংকার থেকে প্রতিদিন সুকৌশলে লাখ লাখ টাকার জ্বালানি তেল চুরি হয়ে যাচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয়, প্রকাশ্যেই এ কার্যক্রম চললেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ভূমিকা রহস্যজনকভাবে নীরব। একাধিক সূত্র জানায়, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহের জন্য ভৈরব নদীর তীরে গড়ে ওঠে এই তিনটি বড় ডিপো। চট্টগ্রাম থেকে তেলবাহী জাহাজ এসে নদীতে নোঙর করে ৪-৫ দিন পর্যন্ত খালাসের অপেক্ষায় থাকে। এই সময়টাকেই কাজে লাগায় সংঘবদ্ধ চোরচক্র।
অভিযোগ রয়েছে, খুলনার কাশিপুর, খালিশপুর ও দিঘলিয়ার ফরমাইশখানা এলাকার একটি প্রভাবশালী চক্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের সঙ্গে আঁতাত করে প্রতিদিন তেল চুরি করছে। পরে সেই তেল শহর ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন ডিলার ও দোকানে বিক্রি করা হচ্ছে।
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ডিপোর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, ট্যাংকারের স্টাফ, ট্যাংকলরি চালক ও শ্রমিকদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তারা অতিরিক্ত তেল লোড করে বা সরাসরি পাইপ খুলে ড্রামে ভরে তেল সরিয়ে নেয়। এরপর পূর্বনির্ধারিত ঘরে মজুত করে তা বিক্রি করা হয়। খালিশপুর ও কাশিপুর এলাকায় প্রায় দুই শতাধিক স্থানে অবৈধভাবে তেল সংরক্ষণের ঘর গড়ে উঠেছে। কোথাও শাটারযুক্ত দোকান, কোথাও বসতবাড়ির ভেতরে তৈরি করা হয়েছে গোপন মজুদ কেন্দ্র। ট্যাংকলরি ডিপো থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব স্থানে তেল নামানোর ঘটনা ঘটে।
এছাড়া নদীতে নোঙর করা জাহাজ থেকেও সরাসরি নৌকার মাধ্যমে ক্যানভর্তি তেল চুরি করা হচ্ছে। এমনকি ট্রেনের জ্বালানি তেলবাহী ওয়াগন থেকেও দীর্ঘদিন ধরে তেল চুরির অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, জাহাজ নিয়ন্ত্রণ ও তেল পাচারের জন্য একটি চক্র নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ‘ডাক’ দিয়ে জাহাজ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এতে করে প্রতি বছর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে এবং সরকার হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব। এই অবৈধ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এলাকায় একাধিক হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। ফরমাইশখানা বার্মাশেল খেয়াঘাট এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কয়েকজন নিহত হয়েছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে খালিশপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুজ্জামান জানান, “যেখানে অভিযোগ পাচ্ছি, সেখানেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু তেল উদ্ধার করা হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আরও বলেন, নদীতে সংঘটিত অপরাধের বিষয়টি নৌ থানার আওতাধীন।
অন্যদিকে, কেএমপি সদর নৌ থানার ওসি বাবুল আক্তারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ভৈরব নদকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই তেল চোরাচালান সিন্ডিকেট এখন এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের এই অপচয় ও অপরাধচক্র আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা করছেন


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন